দেশের দুর্বল নিরীক্ষা ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর কয়েক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার সহজ হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের দায় নিরীক্ষকরা এড়াতে পারেন না বলেও মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে গতকাল আইসিএমএবি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ এ কথা বলেন। ‘অডিট আওতা সম্প্রসারণে সংস্কার প্রস্তাব’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে আইসিএমএবির সভাপতি বলেন, ‘বর্তমানে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের নিরীক্ষা ব্যবস্থার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রয়েছে। ফলে সেখানে একচেটিয়া আধিপত্যের প্রতিফলন ঘটছে। নিরীক্ষা ব্যবস্থায় এই একক কর্তৃত্ব ও গত দেড় দশকের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের নিরীক্ষা ইকোসিস্টেম সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর প্রমাণ হয়েছে।’ এটি ব্যাংক, আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার থেকে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ জানান, এ দুর্বল ব্যবস্থার কারণে দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে আনুমানিক ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের কারণে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ভালো মানের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে দ্বিধা বোধ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইসিএমএবি সিএমএ (কস্ট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ম্যানেজমেন্ট) পেশাজীবীদের আর্থিক নিরীক্ষা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ দাবি করেছে। বিশেষ করে, কোম্পানি আইনে যেসব প্রতিষ্ঠানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সিএ) ও সিএমএ প্রতিষ্ঠানগুলো অডিট বা নিরীক্ষা করে না, সেসব প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষার সুযোগ চেয়েছে আইসিএমএবি। এজন্য অর্থবিল পাস হওয়ার আগেই দেশের নিরীক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে আইন সংশোধনের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান ও প্রায় ৫০০ জন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সারা দেশের নিবন্ধিত তিন লাখের বেশি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা করে থাকেন। আইসিএমএবি মতে, এত কমসংখ্যক পেশাদার দিয়ে দেশের পুরো অডিট ইকোসিস্টেম চালানো বাস্তবসম্মত নয়।
মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নিরীক্ষা একটি বিশেষায়িত পেশাগত সেবা। এ খাতে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে, যা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। আমরা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের প্রতিদ্বন্দ্বী নই বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে চাই।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) মাধ্যমে প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টেন্ট (সিএ ও সিএমএ) দ্বারা লিমিটেড কোম্পানি ব্যতীত সব প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করানোর বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় অর্থবিল থেকে সিএমএ-দের বাদ দেয়া হয়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে হলে নিরীক্ষা ইকোসিস্টেমে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। এফআরসি এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’
সংবাদ সম্মেলনে আইসিএমএবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম ও মো. দেলোয়ার হোসেন, সহসভাপতি মো. কাউসার আলম, সচিব হাসনাইন তৌফিক আহমেদ, কাউন্সিল সদস্য মো. আখতারুজ্জামান ও মো. জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।